মব কি এবং কখন মব সংঘটিত হয় ?
"মব" (Mob) শব্দটি সাধারণত এমন একদল উত্তেজিত বা ক্রুদ্ধ মানুষের প্রতি
নির্দেশ করে, যারা হঠাৎ করে একটি নির্দিষ্ট কারণে সংগঠিত হয়ে পড়ে এবং সাধারণত সহিংস
বা বিশৃঙ্খল আচরণ করে । সমাজবিজ্ঞান বা অপরাধবিজ্ঞানে একে "মব বিহেভিয়ার"
(mob behavior) বা "জনতা আচরণ" হিসেবেও চিহ্নিত করা হয় ।
মব কী?
"মব" হচ্ছে এমন একগুচ্ছ মানুষ যারা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য বা আবেগের বশবর্তী
হয়ে হঠাৎ করে সমবেত হয় এবং দলগতভাবে একটি কাজ করে অনেক সময় সেটি সহিংস হতে পারে ।
উদাহরণ:
· কোনো অপরাধীর বিরুদ্ধে জনতা নিজেই
বিচার করতে উদ্যত হলে (যাকে "মব জাস্টিস" বা গণপিটুনি বলা হয়)
· রাজনৈতিক উত্তেজনায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি
করা
· ধর্মীয় উস্কানিতে সহিংসতা ছড়ানো
মব কখন সংঘটিত হয়?
মব সাধারণত তখন সংঘটিত হয় যখনঃ
· একটি উত্তেজনাকর ঘটনা ঘটে, যেমন,
কারো চুরি ধরা পড়া, কোনো শিশুচোর সন্দেহ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ইত্যাদি ।
· লোকজন আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে, যুক্তিবুদ্ধির
চেয়ে আবেগ বেশি কাজ করে ।
· নেতৃত্বহীন পরিবেশ থাকে, কেউ দায়িত্ব
না নিলে বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা না করলে মব গঠন সহজ হয় ।
· গুজব বা ভুল তথ্য ছড়ায়, সামাজিক
মাধ্যমে বা মুখে মুখে ছড়ানো ভুল তথ্য অনেক সময় মব তৈরি করে ।
মবের প্রভাব ও ঝুঁকি:- নিরপরাধ মানুষ আহত বা নিহত হতে পারে
- সম্পত্তি ধ্বংস হয়
- আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে
- সামাজিক সহিংসতা ও বিভাজন বাড়ে
মব পরিশ্তিতি সৃষ্টি হলে আক্রান্ত ব্যক্তির করণীয় কি ?
মব পরিস্থিতি (Mob Situation) খুবই বিপজ্জনক এবং জীবনহানির আশঙ্কা থাকে । এ ধরনের
পরিস্থিতিতে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রধান করণীয় হলো নিজের জীবন রক্ষা করা এবং উত্তেজনা
থেকে দূরে থাকা ।
নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় দেওয়া হলোঃ
মব পরিস্থিতিতে আক্রান্ত ব্যক্তির করণীয়ঃ
- ভয় বা রাগ দেখালে জনতা আরও উত্তেজিত হয়ে উঠতে পারে ।
- মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করুন ।
- যুক্তি বা ব্যাখ্যা এই সময় কাজ করে না ।
- মব মানসিকতা যুক্তি মানে না, বরং আবেগে চলে ।
- যদি সুযোগ থাকে, নিরাপদ কোন স্থান বা আশ্রয়ে চলে যান ।
- কোনো দোকান, গৃহ বা পুলিশের আশ্রয় নিতে পারেন ।
- কারো চোখে চোখ রেখে শান্তভাবে বলুন, “আমি কিছু করিনি” বা
“আমার কথা শুনুন” ।
- একজন মানুষের সহানুভূতি পেলে, সে হয়তো বাকিদের থামাতে পারে
।
- যদি সরাসরি হামলা হয়, নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করুন (যেমন
হাত দিয়ে মাথা ঢেকে রাখা, নিচু হয়ে যাওয়া) ।
- কিন্তু প্রতিরোধমূলক হামলা করবেন না, এতে জনতা আরও হিংস্র
হতে পারে ।
- "আমি নির্দোষ", "পুলিশ ডাকুন",
"দয়া করে আমাকে মারবেন না" - এ ধরণের বাক্য বলুন ।
- দ্রুত কাউকে জানাতে চেষ্টা করুন, যেমনঃ “আমি বিপদে আছি”,
“লোকজন আমাকে মারছে” ইত্যাদি ।
- আশেপাশে কেউ যদি ভিডিও করে, সেটি ভবিষ্যতের আইনি সহায়তায়
কাজে আসতে পারে ।
পরবর্তীতে করণীয়:- পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হলে থানায় অভিযোগ করতে হবে (GD বা
FIR) ।
- চিকিৎসা গ্রহণ করুন এবং সকল ক্ষতির ডকুমেন্ট রাখুন ।
- মানবাধিকার সংস্থার বা আইনি সহায়তা সংস্থার সহায়তা নিতে
পারেন ।
🔴 বিশেষ সতর্কতাঃ
কখনোই মব পরিস্থিতিতে নিজে আইন হাতে নেবেন না বা পাল্টা আক্রমণ করবেন না। এতে নিজের
বিপদ আরও বাড়ে ।
কোন একটি দেশে কখন মব এর ঘটনা বৃদ্ধি পায় ?
একটি দেশে মব বা গণপিটুনির ঘটনা সাধারণত তখনই বৃদ্ধি পায় যখন সমাজে বা রাষ্ট্রে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের অবস্থা বা সংকট বিরাজ করে। এগুলো রাজনৈতিক, সামাজিক, আইনি কিংবা অর্থনৈতিক সমস্যার ফসল। নিচে ব্যাখ্যা করছিঃ
আরও পড়ুন...
আরও পড়ুন...
মবের ঘটনা কখন বৃদ্ধি পায় ?
- জনগণ যদি মনে করে পুলিশ বা প্রশাসন অপরাধীদের বিচার করছে না, তখন তারা নিজেরাই “বিচারক” হয়ে উঠতে চায় ।
- যেমন: ধর্ষণ, চুরি বা শিশু অপহরণে অভিযুক্তদের জনতা নিজেই শাস্তি দেয় ।
- অপরাধ করলে কেউ শাস্তি পায় না - এমন ধারণা তৈরি হলে মানুষ মব তৈরি করে বিচার করতে চায় ।
- দীর্ঘসূত্রতা বা দুর্নীতি আইন ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা সৃষ্টি করে ।
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা মুখে মুখে গুজব ছড়ালে মব দ্রুত তৈরি হয় ।
- যেমনঃ “শিশু অপহরণকারী ধরা পড়েছে” — এমন গুজবে নিরপরাধ লোককে পিটিয়ে হত্যা ।
- সংবেদনশীল ইস্যুতে কেউ উস্কানি দিলে মানুষ উত্তেজিত হয়ে সহিংস হয়ে পড়ে ।
- এই ধরনের মব অনেক সময় পরিকল্পিতও হতে পারে ।
- অল্পশিক্ষিত বা আবেগপ্রবণ জনগোষ্ঠী যুক্তি নয়, আবেগে কাজ করে ।
- তারা আইনের গুরুত্ব বোঝে না ।
- দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে ক্ষোভ জমে থাকে, যা হঠাৎ এক ঘটনায় বিস্ফোরণ ঘটায় ।
- ছোট ছোট অপরাধেও তারা সহিংস প্রতিক্রিয়া দেখায় ।
- অপরাধ সংঘটিত হলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে ।
- পুলিশ ও বিচার বিভাগকে দক্ষ ও দায়িত্বশীল করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ আইনের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারে ।
- জনসাধারণকে আইন ও মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে হবে ।
- মবের ক্ষতিকর প্রভাব ও আইনের গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষামূলক ক্যাম্পেইন চালানো উচিত ।
- সামাজিক মাধ্যম ও গণমাধ্যমে গুজব ও মিথ্যা খবর ছড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে ।
- গুজব শনাক্ত করে দ্রুত সংশোধন ও ভ্রান্ত তথ্য সরানোর প্রক্রিয়া চালু রাখতে হবে ।
- ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সমঝোতা বাড়াতে সমাজের সকল স্তরে কাজ করতে হবে ।
- সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি থেকে বিরত থাকতে হবে ।
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা ও সহিষ্ণুতা সম্পর্কে জোর দিতে হবে ।
- আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা শেখানো জরুরি ।
- স্থানীয় সমাজ নেতা, ধর্মীয় নেতা, ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা মব পরিস্থিতি এড়াতে ভূমিকা রাখতে পারেন ।
- জনতার মনোভাব শান্ত রাখতে ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে সহায়তা করতে পারেন ।
- মব গঠন বা মব লিঞ্চিং-এ জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে ।
- মব তৈরির পেছনে যারা উসকানি দেয় তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে ।
- জনগণকে প্রকৃত ও সঠিক তথ্য দ্রুত পৌঁছে দিতে হবে ।
- স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ মব গঠন হওয়ার আগেই সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে ।
মব পরিস্থিতিতে আক্রান্ত ব্যক্তির করণীয়ঃ
1. শান্ত থাকুন ও উত্তেজিত হবেন না
2. জনতার সাথে তর্ক বা প্রতিবাদ না করা
3. পরিস্থিতি থেকে দ্রুত সরে যাওয়ার চেষ্টা করুন
4. জনগণের একজনকে টার্গেট করে সহানুভূতি তৈরি করার চেষ্টা করুন
5. আত্মরক্ষা করুন, তবে আক্রমণ করবেন না
6. চিৎকার করে আশেপাশের মানুষদের সাহায্য চাইতে পারেন
7. যদি সম্ভব হয়, পুলিশ বা আত্মীয়কে কল দিন
8. ভিডিও বা প্রমাণ রাখার চেষ্টা (যদি সম্ভব হয়)
🔴 বিশেষ সতর্কতা:
কখনোই মব পরিস্থিতিতে নিজে আইন হাতে নেবেন না বা পাল্টা আক্রমণ করবেন না। এতে
নিজের বিপদ আরও বাড়ে ।
